Skip to main content

ভালোবাসার অশ্রুবিন্দু


ভালবাসার অশ্রুবিন্দু

ভালবাসার অশ্রুবিন্দু
আসলে এ অবস্থায় আমাদের কিছুই করার থাকেনা। রোগী মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতি ধরে রাখে সেই অংশ গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারি ভাষায় যার নাম Alzheimer. আপনি বরং এক কাজ করুন রোগীকে বাসায় নিয়ে যান। শুধু শুধু এত গুলো টাকা নষ্ট করবেন ক্যানো?” ডাক্তারের কথা গুলো অবিশ্বাস্য মনে হল। এর মানে আমার অবনী পাগল হয়ে গেছে। এ কিছুতেই সম্ভব না। আমি ডাক্তারকে শান্ত গলায় বললাম, আপনার কোথাও হয়তো ভুল হচ্ছে। আপনি কি রিপোর্ট গুলো আবার চেক করবেন? আসলে আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। এই সেদিন ও স্বাভাবিক ছিল। হঠাত্ করে. . .
আমার কথা শুনে ডাক্তার বললেন,দেখুন আমি আপনাকে সরাসরি না বললেও পারতাম। আসলে আপনি রোগীর স্বামী। আপনাকে ভেঙে পড়লে চলবেনা। বাংলাদেশে যে সব নিউরোলজিস্ট আছেন আপনি তো তাঁদের সবাইকেই দেখিয়েছেন। শেষ বেলায় আমার কাছে এসেছেন। মিথ্যে আশ্বাস আমি রোগীদের দেইনা। বরং যতদিন ও বাঁচবে ভালোবেসে আগলে রাখুন। সবাইকে তো একদিন মরতে হবে। আমি চুপ করে ডাক্তারের রুম থেকে বের হয়ে অবনীর কেবিনে গেলাম। অবনী তখনো ঘুমোচ্ছে। কি শান্ত নিষ্পাপ এক খানি মুখ। চোখে মুখে মায়ার কমতি নেই। ছয়মাসের বাচ্চা শিশুর মত ঘুমিয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। আমি অবনীর মাথায় আলতো করে হাত রাখতেই ওর ঘুম ভেঙে গেল। আমার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বলল,আপনি? আপনি কে? আমার পাশে বসে আছেন ক্যানো? ছাড়ুন। অবনীর কথা শুনে কান্না এল। ইচ্ছে হচ্ছিল আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিত্কার করে কাঁদি। যে আমি ছিলাম অবনীর সবচেয়ে কাছের আজ তাকেই ও চিনতে পারছেনা। অথচ কত বৃষ্টির রাত আমরা না ঘুমিয়ে পার করেছি। অবনীর পাগলামী গুলো ছিল মাত্রা অতিরিক্ত। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমাকে জাগিয়ে বলতো, এই কবিতা শোনাও, অই যে আমার প্রিয় নজরুলের সেই কবিতাটি, “যে দিন আমি হারিয়ে যাবো বুঝবে সেদিন বুঝবে অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে. . . .”
আমি অবনীকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতাম। বলতাম, আর কোন কবিতা পেলেনা। বেছে বেছে এই অলক্ষুনে কবিতাটাই তোমার প্রিয়। নজরুলের তো আরো কত কবিতা আছে। তুমি না. . . .
আমার কথা শুনে অবনী বলতো, তোমাকে পরখ করছি। জানোতো বিয়ের পর পুরুষের ভালোবাসা অনেকটাই দেহ কেন্দ্রিক হয়ে যায়। দেখলাম আমার প্রতি তোমার আবেগ আগের মতই আছে কী না। আমি বলতাম, তো কী দেখলে। -দেখলাম তুমি আগের চেয়েও অনেক বেশী রোমান্টিক হয়ে গ্যাছো। তবে……
-তবে কী? -অনেক বেশী শাসন কর্তা। কথায় কথায় ধমক দাও। অবনীর কথা ভারী হয়ে এলে বুঝতাম ও মন খারাপ করেছে। আমি জানি বিশাল এ পৃথিবীতে আমি ছাড়া অবনীর কেউ নেই। ওর আবেগ অনুভূতি,মান অভিমান সবকিছুই আমি। আমি অবনীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে গেয়ে উঠতাম, “এত জল, ও কাজল চোখে পাষানী আনলে বল কে?. . . .
আমার গানের পাল্টা জবাব দিয়ে অবনী গেয়ে উঠতো, “নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল মলিন ও হয়েছে ঘুমে চোখের ও কাজল এ নয় আঁখিজল……
গান আর পাল্টা গানে এভাবেই পার হত আমাদের জেগে থাকা নির্ঘুম রাত গুলো অবনীর সাথে ফেলা আসা দিন গুলোর কথা মনে হলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। অবনীর সাথে কী অদ্ভুত ভাবে পরিচয় হল। আমার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। নজরুলের মাজারের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সবসময় স্যালুট দিতাম। একবার অবনীর চোখে পড়ল। মেয়েটাতো হেসেই খুন। আমি মোটামুটি বিব্রত বোধ করলাম। এক প্রকার সাহস করে এগিয়ে গিয়ে বললাম,হাসছেন ক্যানো?অবনী বলল, আপনার পাগলামো দেখে। নজরুলকে খুব ভালোবাসেন বুঝি? আচ্ছা বলুন তো “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী” গানটির শেষ লাইন কী? মেয়েটা গড়গড় করে একগাদা কথা বলে ফেলল। আমি হকচকিয়ে গেলাম। বললাম,
আপনার কী ধারনা আমি নজরুলের সব গান মুখস্ত করে ঘুরে বেড়াই? আমার কথা শুনে অবনী বলল, কিছু কিছু গান আছে যা মনে রাখতে হয়। নজরুলকে এত শ্রদ্ধা করেন অথচ তার এই বিখ্যাত গানটি মনে নেই? অবনী হেসে ফেলল। আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে চলে এলাম। সেদিন নজরুলের ওপর খুব রাগছিল। নেটে সার্চ দিয়ে গানটিকে খুঁজে বের করলাম। বেশ কয়েক বার শুনতেই মুখস্ত হয়ে গেল। এরপর বেশ কিছু দিন অবনীকে ভার্সিটির চারপাশে খুঁজে বেড়াতে লাগলাম। অবনীর সাথে আমার পরবর্তী দেখা হয় ছায়ানটে। সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে কাজ করার সুবাদে। নজরুল জয়ন্তীতে অবনীর গাওয়া গানে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। গান শেষে নিজেই সাহস করে বললাম, অনেক ভালো গেয়েছেন। আমাকে দেখে অবনী চমকে উঠল। বলল,ওহ আপনি? তারপর কী খবর নজরুল প্রেমী? আমি বললাম, অই গানটির শেষ লাইনটি কিন্তু আমি জানি। ” তোমারে ঘেরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল. . .
আমার কথা শুনে অবনী মৃদু হেসে বলল, বুঝতে পেরেছি পুরো গানটি মুখস্ত করে এসেছেন। হা হা হা এই প্রথম লক্ষ করলাম অবনীর হাসি সুন্দর। অনেকটাই শিউলী ফুলের মত। আমি কিছুক্ষন এক নাগাড়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। শাদা শাড়ী লাল পাড় আর খোঁপায় বেলীফুল। অবনীকে একটুকরো মেঘবালিকার মত লাগছিল। আমি বললাম,
আপনি সুন্দর অনেক। অবনী আবারো হাসল। বলল,সবাই বলে। এতো পুরুষের সস্তা ডায়লগ। -পুরুষ সম্পর্কে অনেক খারাপ ধারনা বুঝি? -খারাপ কে বলল? আমি শুধু বললাম সব পুরুষ ই মেয়েদের বাহ্যিক রূপটা দেখে। অথচ হৃদয়ের গভীর কেউ দৃষ্টিপাত করেনা। যাহোক আমি অবনী। রসায়ন বিভাগে পড়ছি। তৃতীয় বর্ষ। আপনি? আমি পরিচয় দিলাম। হিসেবে অবনী আমার দু বছরের ছোট। এরপর থেকে তুমি করে বলার আব্দার। আমিও না করলাম না। অবনী আমাকে আপনি করে বলতো। আমাদের দিন গুলো ছিল অস্বাভাবিক সুন্দর। অবনী ছিল সত্যিকারের নজরুল প্রেমী। ভেতরে নজরুলকে চর্চা করতো। প্রায়ই শাড়ী পড়তো। খোপায় কখনো বেলী কখনো শেফালী। কপালে ছোট্ট একটা টিপ। মনে হত সুন্দর এ অবনীর মাঝে এক টুকরো অবনী যা সম্পূর্নই আমার। প্রিয় মানুষগুলোর সবকিছুই ভালো লাগতো। অবনীর চোখ,চুল,নাকের ওপর জমা বিন্দু ঘামের নকশা। সবকিছু। আমাদের কথা হতো সাহিত্য নিয়ে। ভীষন সাহিত্য প্রেমী ছিল ও। আমি ভালোবাসতাম রবীন্দ্রকে। শুনে ও বলতো,আপনার কবিতো শুধু রোমান্টিকতা নিয়ে লিখেছে। কী ভাবে যে সে বিশ্ব কবি হলো। অথচ দেখুন নজরুল জীবনের চরম বাস্তবতা গুলো কী সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে। অবনীর সাথে তর্ক করতে মজাই লাগতো। আমি বলতাম, “আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন তোমাতে করিব বাস. . .
তোমার কবির সাধ্য কী এত রোমান্টিক গান লেখার। আমাকে এক মুহূর্ত সুযোগ না দিয়ে ও বলতো, “শাওন ও রাতে যদি স্মরনে আসে মোরে বাহিরে ঝড় বহে ভেতরে বারি ঝড়ে. . . .
আসা করছি আপনার উত্তর পেয়ে গেছেন। শুনুন আমার কবিকে নিয়ে বলার আগে সাবধানে কথা বলবেন। অবনীর বিদ্রোহী সুর আমার মনের ভেতরে ঢুকে যেত। মনে হত নজরুলের লালিত্যে বেড়ে ওঠা অবনী আসলেই অনেক বুদ্ধিমতী, স্বাধীন চেতা এবং ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন। নজরুল আর রবীন্দ্র নিয়ে তর্ক করতে করতে কখন যে দুজনে হৃদয়ের খুব কাছাকাছি চলে এলাম টের পেলাম না। আমাদের পৃথিবী তখন কবিতার মতই জটিল এবং ভয়াবহ রকমের সুন্দর। আপনি তুমি সম্পর্ক তুমিতে গড়িয়েছে অনেক আগে। অবনী ওর জীবনের না বলা কথা গুলো বলে ফেললো নির্দ্ধিদায়। একজনকে ভালোবাসতো। কলেজে থাকতে। কিন্তু কখনো বলতে পারেনি। কথাটা শুনে খুব খারাপ লাগল। আমি স্মিত হাসির আড়ালে বললাম, “সহজ কথা বলতে আমায় কহ যে সহজ কথা যায়না বলা সহজে. . .
হঠাত্ করেই লক্ষ করলাম অবনীর চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে। কিছুক্ষন দু জনে চুপ ছিলাম। নীরবতা ভেঙে বললাম, কিছু বলছোনা যে. . . .
অবনী বলল, “অনেক কথা বলার মাঝে লুকিয়ে আছে একটি কথা বলতে নারি সেই কথাটি তাই এ মুখর ব্যাকুলতা অবনীর কথা শীতল স্রোতের মত হৃদয়ে বয়ে গেল। আমি এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ওর রুগ্ন হাত ধরে বললাম, “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোপায় তারার ফুল. . . .
অবনী হাত ধরে কেঁদেই ফেলল। প্রবল বর্ষার বিকেল ছিল। আকাশে তখন বিজলি চমকাচ্ছে। ছবির হাটের পারপাশে প্রকৃতি প্রেমী মানুষের ভীড়। চারপাশে ধুলো উড়ছে। একটু পরেই বৃষ্টি নামলো। ঝুম বৃষ্টি। ঘন শ্রাবনের অবাধ বর্ষন এসে ভিজিয়ে দিল আমাদের। আমি শক্ত করে অবনীর হাত ধরে বললাম, চলো বৃষ্টিতে ভিজি।
কাহিনী গুলো কত দ্রুত ঘটে গেল। অবনীকে মনের কথা গুলো খুলে বললাম। ওর ও নিষেধ ছিলনা। কিন্তু দু জনের মাঝে ভেদাভেদের দেয়ালটা ছিল ধর্মের। যদিও আমি জানতাম অবনী হিন্দু তারপরেও অবনীর প্রতি আমার ভালোবাসার যে তীব্র স্রোত তৈরি হল তাতে ভেসে গেল আমাদের গতানুগতিক জীবনের সব পঙ্কিলতা। অবনী আমার ঘরে এল অনেক প্রতীক্ষার প্রহর পেরিয়ে। ওর পরিবারের বাঁধা ছিল। ও জানতো আমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে ওর কষ্ট হবে। আর তাই অনেকটা নজরুলের
কবিতার মতই সাম্যবাদী দৃষ্টি দিয়ে আমাকে ওর সবচেয়ে আপন করে নিল। আমি অগোছালো এ পৃথিবীর মাঝে গোছালো একটুকরো স্বর্গ পেলাম। ওর পরিবারের কাছ থেকে তখন থেকেই ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লাস্যময়ী একটি মেয়ে হঠাত্ করেই চুপসে গেল। সারাক্ষন কী যেন ভাবতো। বিয়ের প্রথম দু বছর অবনী বেশ ভালোই ছিল। প্রতি সন্ধ্যেবেলা আমি নামাজ পড়তাম আর ও সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাত। সব কিছুই চোখের সামনে ভাসছে। আমি ওর সব কথা মেনে নিয়েছিলাম। ওর এক রোখা জেদ। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া জীবন যাপন। সবকিছু। মাঝেমাঝে নিজেকে অপরাধী মনে হত। অবনী নিজেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলত, দেখ। আমি অনেক ভালো আছি তোমাকে নিয়ে। তুমি একটুও চিন্তা করোনা। বিয়ের পর আমি ওকে মুসলমান হতে বলেছিলাম। একদিন বললাম, আমায় মনে হয় তুমি মুসলমান হলে তোমার আর আমার মাঝে যে দেয়ালটা আছে তা ভেঙে যাবে. . .
তুমি হয়তো আমাকে আলাদা করে দিচ্ছ। অবনী বলেছিল, আমাদের ধর্ম ভালোবাসার। তোমার আল্লাহ আর আমার ভগবান তো একই সত্তা। ছোট্ট জীবনের মাঝে কেন আমরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাই। অবনীর কথার উত্তর দিতে পারতাম না। শুধু ওর হৃদয়ের প্রশান্ত বিশালতায় নিজেকে তুচ্ছ মনে হত।
একসময় অবনী নিজেই বলতো, “আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেবনা ভুলিতে আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ বেনী যাবে যবে গুলিতে তবু আমারে দেবনা ভুলিতে. . . অবনীর সাথে আমার স্বাভাবিক জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতি গুলো অনেক বেশি। প্রায়ই রাতে অবনী কাঁদতো। নীরবে। আমি টের পেতাম। কিন্তু ও কখনো জানতো না। কখনো কখনো মানুষকে একা থাকতে দিতে হয়। অন্যকারো থাকাটা তখন নিষ্প্রোয়োজন। আজ অনেক দিন হল অবনীর সাথে মনের কথা গুলো বলতে পারিনা। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত একটা মেয়ে কীই বা বুঝবে।
প্রথমে প্রথমে ও ছোট ছোট ঘটনা গুলো ভুলে যেত। আমি ভাবতাম হয়তো ও আত্মভোলা হয়ে গেছে। একটা পর্যায়ে সমসাময়িক ঘটনা গুলো ভুলতে শুরু করলো। আমি অবাক হতাম। অনেক বার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও ও যেতে চায়নি। একসময় অবস্থার অবনতি ঘটলো। আর এখন ও আমাকেই চিনতে পারেনা। মাঝেমাঝে ওর কাপড় বদলে দেবার সময় ও ফ্যালফ্যাল করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। চিরচেনা আমি হঠাত্ করেই অচেনা হয়ে গেলাম। নার্সের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। “আপনাকে ডাক্তার স্যার ডাকছেন” শার্টের হাতা দিয়ে চোখের পানি মুছলাম। ইদানিং চোখের পানিও বড় বেশী বেপরোয়া হয়ে গেছে। যখন তখন চোখ থেকে বের হয়। ডাক্তার বললেন, বৃষ্টি থেমেছে। আমি এমবুলেন্স দিচ্ছি সাথে দুজন স্টাফ। আর শুনুন আবারো বলছি। ভেঙে পড়বেননা। আর কয়েক মাস হয়তো ও বাঁচবে। যদি অলৌকিক কিছু না ঘটে। আর এই মেডিসিন গুলো সময় করে খাওয়াবেন। আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না। কোনমতে কষ্ট চেপে বললাম,আচ্ছা। অবনীকে নিয়ে বাসায় ফিরতে রাত হলো। সুদীর্ঘ মহাকালের আর অল্প কিছু রাত অবনীকে আমার কাছে পাবো। আমি অবনীর মাথা অনেক যত্নে কোলের ওপর নিলাম। গুনগুনিয়ে গাইলাম, “প্রিয় এমন রাত যেন যায়না বৃথা পরি চাঁপা ফুলের শাড়ি খয়েরী টিপ জাগি বাতায়নে জ্বালি আঁখি প্রদীপ মালা চন্দন দিয়ে মোর মালা সাজাই”……
শেষ বারের মত অবনীকে ছায়ানটে নিয়ে এসেছি। আজ নজরুলের জন্মদিন। আগামি বছর এই দিনে হয়তো ও আমার কাছ থেকে অনেক দূরে থাকবে। অনেক। নিজ হাতে ওকে শাড়ী পড়ালাম। সাদা শাড়ী। চুলে খোপা করে দিয়েছি। অনেক খুঁজেও কোন বেলী কিংবা শিউলী পাইনি। অবনীর অশান্ত মন অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে কেঁদে উঠলো। ছায়ানটে গান চলছে। “মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম ছিলাম নদীর কূলে. . . . .
অন্য একটা জনম পেলে ভালোই হত। কেন এক জনমের জন্য পৃথিবীতে আসা। ভালোবাসাবাসির সময় গুলো কেন এত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ভাবনা গুলো যখন জমাট বাঁধা ঠিক তখন অবনীর কন্ঠ শুনে চমকে উঠলাম। ও গুনগুন করে গাইছে, “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোপায় তারার ফুল কর্নে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল. . . .
.হঠাত্ ওর খোপায় হাত দিয়ে ও বললো, এই আমার তারার ফুল কোথায়? বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি বাকরুদ্ধ এই আমি এক মুহূর্তে অবনীর হাত ধরলাম। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে বললাম, খোদা তোমার পৃথীবিতে কত কিছুই তো অলৌকিক হয়। এমনকি হতে পারেনা অবনী চিরতরে সুস্থ হয়ে গেছে। উদভ্রান্তের মত অবনীকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম। অবনী শান্ত সুরে বললো, পাগল তুমি? এত ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছ??? আনন্দে আতিশয্যে আমার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো অনেক দিনে জমিয়ে রাখা ভালোবাসার একফোঁটা নিরেট অশ্রুবিন্দু।
*****************************************(সমাপ্ত)*************************************

Comments

Popular posts from this blog

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্প - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - এক বনে ছিল এক হিংস্র বাঘ। সে যেকোনো প্রাণীকে দেখলেই ঝাপিয়ে পড়তো। কাউকে সে মানতো না। একদিন এক নিরীহ হরিণ সেই বাঘের কবলে পড়লো। হরিণটা অনেক যুদ্ধ করেও পালাতে পারলো না। বাঘ মাত্র ওকে সুবিধামতো কামড় বসাবে। এমন সময় হরিণের মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। হরিণ বলল, “ওহে বাঘ। তুমিতো সবাইকেই খাও। আমায় না হয় ছেড়ে দাও। আমার মাংস খেলে তোমার একটুও পেট ভরবে না। তার চেয়ে বরং বিনিময়ে আমি তোমাকে অনেকগুলো গরু দিবো। তা দিয়ে এক মাস চলে যাবে তোমার।” বাঘ কথাটা শুনে ভেবে দেখল কথাটাতো মন্দ না। তাই সে হরিণটাকে ছেড়ে দিল। পরে হরিণ চলে গেল সেখান থেকে। আর বাঘ তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু চালাক হরিণকে আর পায় কে? হরিণতো তার উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জীবনে রক্ষা পেল। তাই গায়ের জোর না থাকলেও বুদ্ধির জোর সবচেয়ে দামি। এই গল্প থেকে আমরা অনেকগুলো শিক্ষা নিতে পারি: 1। কাউকে সহজেই বিশ্বাস করা ঠিক না। সহজেই বিশ্বাস করাটা বোকামি। 2। বিপদে পড়লে ভয় না পেয়ে বরং ভয়টাকে জয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 3। গায়ের শক্তি না থাকলেও বুদ্ধির জোর দিয়ে ...

ড্রাই আইস কী?

ড্রাই আইস আকর্ষ ণ  সৃষ্টির জন্যে বিভিন্ন সময় গানের স্টেজে অথবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় কুয়াশার মত ধোঁয়া দেখতে পাই আমরা। এটা আসলে ড্রাই আইস বা শুষ্ক বরফ নামেই পরিচিত। তার মানে কি এটা কঠিন পানি? কিন্তু পানি কঠিন হলে কি সেটা ধোঁয়ার মত উড়বে? ড্রাই আইস প্রথমে ড্রাই আইস কি সেটা বলি। সহজে বললে, শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কঠিন রূপকেই ড্রাই আইস বলে। অনেক কম তাপমাত্রায় এবং কম চাপে (−56.4 °C তাপমাত্রা এবং 5.13 atm চাপে) গ্যাসীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে রেখে দিলে সেটি তরলে রূপান্তরিত না হয়ে সরাসরি কঠিন পদার্থের আকার ধারণ করে। এই কঠিন পদার্থটিই আসলে ড্রাই আইস বলে আমরা জানি। তাহলে এই কঠিন পদার্থটি আবার ধোঁয়ার মতই উড়বে কিভাবে? আসলে ড্রাই আইসকে যখন উষ্ণ ও গরম পানির সংস্পর্শে আনা হয়, তখন মেঘের মত দেখতে শুভ্র ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই সাদা ধোঁয়াটি কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড নয়, অধিক ঘনমাত্রার পানির বাষ্পের সাথে মিশ্রিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড। ব্যাপার হচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ফলে গরম পানির বাষ্প ঘনীভূত হয়ে এমন আকার ধারণ করে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাহিত এই কুয়াশাটা অনেক ভারী হয়, তা...

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল)

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল) অক্টোবর 01, 2018 : বিভাগ- ভৌতিক / ভয়ংকর গল্প গল্প লিখেছেন :  সংগ্রহীত তখন আমি সিলেট বিভাগের জেলা ছাতকের খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকতা। আমাদের অফিসটা ছিল সুরমা নদী কোল ঘেষে। গাছগাছালী ঘেরা ছায়া মনোরম এক পরিবেশ । আমার অফিস থেকে একটু হেটে কিছুদুর গেলেই সুরমা নদীর পাড়ে ঘেষে একটা শশ্মান। ঐ শশ্মানে একটা মানুষ প্রমান কালীর মূর্তি ছিল । কালীর মূর্তিটার সারা শরীর ছিল কালো রংয়ের ছিল । পরনেও ছিল কালো রংয়ের একটা শাড়ি। পিছনে কালো এলোমেলো চুল গুলো নিতম্ব ছেড়ে নিচে নেমেছে। এক হাতে ত্রিশুল , আরেক হাতে একটা সাপ । মুখ থেকে অনেকটা বেরিয়ে থাকা লাল রংয়ের জিব্হাটা মুখ থেকে ভয়ংকর ভাবে বের হয়ে বুক ছুয়েছে। চোখ দুটি টকটকে লাল। ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে । হঠাৎ দেখলে চমকে উঠতে হয়। দিনের বেলা মুর্তিটাকে দেখলে তেমন একটা ভয় লাগত না , কিন্তু সন্ধ্যা বেলা পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দেখলে বুকের ভিতর অজানা এক ভয়ের শিহরন জাগত। তখন মনে হত ওটা মুর্তি নয়, সত্যি জীবন্ত ভয়ংকর এক মানবী । আমি শিহরীত হওয়ার জন্য প্রায় সন্ধ্যা বেলায় যেতাম। আমার এভাবে ওই সময় প্রায় যেতে দেখে অফিসের দাড়োয়ান একদিন ব...