Skip to main content

মজাদার আইসক্রিমের জন্মকথা!!!

মজাদার আইসক্রিমের জন্ম কথা



আইসক্রিম এক মজাদার খাবারের নাম। আইসক্রিম পছন্দ করে না এমন লোক খুব কমই আছে। এমন অনেকে আছেন যারা আইসক্রিম খুবই পছন্দ করেন কিন্তু ঠাণ্ডা সমস্যার কারণে খেতে পারেন না। আইসক্রিম (Ice cream) শব্দটি ইংরেজি শব্দযার শাব্দিক অর্থ বরফ ক্রিম। সাধারণত হিমায়িত বরফের সাথে বিভিন্ন মিষ্টান্ন, ফল, চিনি, দুধ, রং ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি করা হয় আইসক্রিম। বর্তমানে আইসক্রিম তৈরির সাথে ফ্লেভারচকোলেট, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের উপাদান মিশ্রণ দেয়া হয়।
আইসক্রিম শব্দটি মূল শব্দ হলেও দেশে দেশে একে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন হিমায়িত কাষ্টার্ডহিমায়িত দই,শরবতগিলাতোমালাই ইত্যাদি। আবার অনেক দেশে আইসক্রিম শব্দটিকে অক্ষরের বেশ কম করে ভিন্নভাবে উচ্চারণ করা হয়। আইসক্রিম এর প্রধান উপাদান হচ্ছে বরফ, সেজন্য এটা খাওয়ার পর সর্দিতে আক্রান্ত হবার ভয় থাকে।
আইসক্রিম প্রথম কবে কিভাবে উদ্ভাবিত হয়েছে এব্যাপারে রয়েছে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প। পারস্য সাম্রাজ্যের মানুষেরা গ্রীষ্মকালে গরমের হাত থেকে বাচতে তুষারের সাথে আঙ্গুরের রস মিশিয়ে খেত। তারা বরফ সংগ্রহ করতো পাহাড়ের উপরে জমা হওয়া তুষার থেকে এবং বরফকে সংরক্ষণ করতো ঠাণ্ডা ধরে রাখার মতো মাটির নিচের চেম্বারে। যাকে বলা হতো ইয়াখচাল। ৪০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে পারস্য বাসীরা এক বিশেষ ধরনের মজার খাবার আবিষ্কার করেন। যা গোলাপ পানি ও সেমাই মিশ্রিত করে তৈরি করা হতো এবং রাজা-রানীকে গ্রীষ্মকালে পরিবেশন করা হতো। এই খাবারের সাথে আইসক্রিম পরিবেশন করা হতো যা তৈরি করা হতো তুষার, জাফরান, ফল ও বিভিন্ন ফ্লেভার দ্বারা।
হাজার বছর ধরে প্রাচীন সভ্যতাগুলো ঠাণ্ডা খাবার হিসেবে বরফকে ব্যবহার করতো। বিবিসির এক রিপোর্টে বলা হয়, প্রায় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ২০০ বছর আগে চীনারা বরফের সাথে চাল ও দুধ মিশিয়ে ঠাণ্ডা খাবার তৈরি করতো। আইসক্রিমের আরও একটি ইতিহাস এই যে, ৩৭ থেকে ৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমের সম্রাট নিরো এক সন্ধ্যায় তিনি তার দাস-দাসীকে সঙ্গে নিয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। সময়টি ছিল গ্রীষ্মকাল। হঠাৎ তার ঠাণ্ডা খেতে ইচ্ছা হলো। তাই শুনে দাস-দাসীরা ছুটে গেল পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে বরফ সংগ্রহ করে তার সঙ্গে মধু আর ফলের রস মিশিয়ে সম্রাটকে খেতে দিল সম্রাট মিষ্টি বরফ পেয়ে খুব খুশি হলেন এবং দাস-দাসীদের পুরস্কৃত করলেন এরপর গরমকাল এলেই সম্রাট নিরোর জন্য এই মিষ্টি বরফ বানানো হতো
আরবের মুসলমানরাই সর্বপ্রথম আইসক্রিমের প্রধান উপাদান হিসেবে দুধকে ব্যবহার করেন। তারা আইসক্রিমকে মিষ্টি করতো ফলের চেয়ে বেশী চিনি ব্যবহার করে। এবং তারাই সর্বপ্রথম আইসক্রিমের আধুনিক যুগের আবির্ভাব ঘটান এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রসারেরও সূচনা করেন। ১০ম শতাব্দীর দিকে আরবের প্রধান শহরগুলোতে যেমন বাগদাদ, দামেস্ক এবং কায়রোয় আইসক্রিম ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তারা বাণিজ্যিক আইসক্রিমগুলো তৈরি করতো বরফ, ক্রিম, বাদাম, দুধ, গোলাপ পানি, শুকনো ফল ইত্যাদি দ্বারা। Maguelonne Toussaint তার “A History of Food” গ্রন্থে লিখেছেন, সম্ভবত চীনাদের শরবত ও আইসক্রিম তৈরির একটি যন্ত্র তৈরির কৃতিত্ব রয়েছে। তারা ভরাট কন্টেইনারে সিরাপের সাথে বরফ ও যবক্ষার মিশ্রণ ঢালতো। যাতে লবণের মতোই পানির স্ফুটনাংক শূন্যের কোটায় নেমে যায়। কিছু বিকৃত ইতিহাস এই যে, ৯৬০-১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে চীনার সং বংশের সম্রাট ইয়াং জং এর সময়ে ইয়াং ওয়ানলি নামক এক কবিরOde to the ice cheese "詠冰酪" (গীতিকাব্য বরফ পনির থেকে) নামক কবিতায় আইসক্রিমের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে প্রকৃত কবিতাটির নাম ছিল Ode to the pastry (গীতিকাব্য প্যাস্ট্রি থেকে)। প্যাস্ট্রি এক ধরনের পাশ্চাত্যের খাবার যা আইসক্রিম নয়। আইসক্রিমের আরও একটি ইতিহাস এই যে, ১২৬০ সালের দিকে ভারতের দিল্লীতে আইসক্রিমের প্রচলন শুরু হয়। তখন ভারতের মুঘল শাসক গন আইসক্রিম খেতেন এবং এটিকে পছন্দ করতেন। তারা দিল্লীর হিন্দুকুশ থেকে ঘোড়ায় করে বরফ আনয়ন করতেন। সেখানে বরফ দিয়ে শরবত তৈরি করা হতো।
মঙ্গোলীয় শাসক কুবলাই খান এর রাজত্বকালে তার সাম্রাজ্যে আইসক্রিম ব্যাপক জনপ্রিয় খাদ্য হয়ে উঠে। কুবলাই খান জানতে পারেন যেতার রাজ্যে আইসক্রিম নামের একটি উপাদেয় খাদ্য তৈরি হচ্ছে তখন তিনি খাদ্যটি ক্রয় করে নিয়ে আসতে বলেন। খাবারটি তিনি খাবার পর খুবই পছন্দ করেন। তাই তিনি ঘোষণা করেনএ খবর যেন পড়শি রাজারা জানতে না পারে। কেননা তিনি চাননি এরকম একটি মজাদার খাবারের কথা অন্য কেউ জেনে যাক। কিন্তু কুবলাই খান না চাইলে কি হবেএই মজার খাবারের কথাটি চাপা থাকে নি। ঠিক সে সময় জাহাজে চড়ে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করতে বেরিয়েছিলেন বিখ্যাত পর্যটক মার্কোপোলো চীন পর্যন্ত জাহাজে আসার পর পায়ে হেটে বিখ্যাত গোবি মরুভূমি অতিক্রম করার পর মার্কোপোলো যখন মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যে এসে উপস্থিত হন তখন তারও সৌভাগ্য হয় সুমিষ্ট বরফ খাওয়ার। তিনিও এই বরফখেয়ে মুগ্ধ হন। ঠাণ্ডা সুমিষ্ট বরফ খণ্ড তার এতই ভালো লাগে যেতিনি এর তৈরি প্রণালী জানার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। শেষপর্যন্ত সফলও হন তিনি। ফেরার পথে তাই এই মজার বরফ তৈরির উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালী সঙ্গে নিয়ে যানদেশে ফিরে গিয়ে মার্কোপোলো খাবারটি তৈরি করলেন এবং সবার কাছে প্রশংসিত হন।
১৫৩৩ সালে যখন ক্যাথরিন দে মেডিসি ডিউক ওর্লিন্সকে বিবাহ করেন তখন তিনি তার সাথে কিছু খাবার ফ্রান্স থেকে আনার কথা বলেন। যার মধ্যে ছিল শরবত ও আইসক্রিম। একশত বছর পর ইংল্যান্ডের প্রথম চার্লস আইসক্রিম সৃষ্টিকর্তাদের আইসক্রিম তৈরির গোপন রহস্য প্রকাশ না করার জন্য আজীবন পেনশন দেবার ব্যবস্থা করেন। যাতে আইসক্রিম একটি রাজকীয় খাবার এ পরিণত হয়। কিন্তু তারপরও সাধারণের মাঝে আইসক্রিম তৈরির চেষ্টা বন্ধ হয়নি। ফলে দেশে দেশে খুব দ্রুত আইসক্রিম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তারা আইসক্রিম তৈরির জন্য বরফের সঙ্গে শুধু ক্রিমই মিশাতোতা নয়। বরং খাবারটিকে সুস্বাদু করে তোলার জন্য বিভিন্ন উপাদান মেশানো হতো। এর মধ্যে মধুফুলের রসমাখন প্রভৃতি এভাবেই ক্রিম আইস দিয়ে বরফের খাবার তৈরি হতে থাকল। ধীরে ধীরে 'ক্রিম আইসনামটি হয়ে গেল আইসক্রিমআর এভাবেই আইসক্রিম ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বের প্রতিটি দেশে দেশে ১৮৫১ সালে বাণিজ্যিকভাবে আইসক্রিমের প্রথম দোকান দেন কার্লো গ্যাটি নামক একজন সুইস-ইতালিয়ান ব্যবসায়ী। ১৯০০ সালের দিকে এসে আইসক্রিম বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আইসক্রিমের দেশে দেশে কিছু ভিন্ন নামও আছে, যথা মালয়েশিয়া ও সিংগাপুরে ইস কাচাং, তুরস্কে দনদোরমা, ইতালিতে গিলাতো, ফিলিপাইনে হালো হালো, দক্ষিণ এশিয়ায় কুলফি, ভারত ও বাংলাদেশে মালাইইত্যাদি।
আইসক্রিম তার উদ্ভব থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অনেক বিস্তার লাভ করেছে। সেই সাথে আইসক্রিমে এসেছে অনেক আধুনিকতা ও নতুনত্ব। ধারনা করা হয় সামনের সময়ে এটি আরও প্রসার লাভ করবে।

------------সংগ্রহকৃত।

Comments

Popular posts from this blog

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্প - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - এক বনে ছিল এক হিংস্র বাঘ। সে যেকোনো প্রাণীকে দেখলেই ঝাপিয়ে পড়তো। কাউকে সে মানতো না। একদিন এক নিরীহ হরিণ সেই বাঘের কবলে পড়লো। হরিণটা অনেক যুদ্ধ করেও পালাতে পারলো না। বাঘ মাত্র ওকে সুবিধামতো কামড় বসাবে। এমন সময় হরিণের মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। হরিণ বলল, “ওহে বাঘ। তুমিতো সবাইকেই খাও। আমায় না হয় ছেড়ে দাও। আমার মাংস খেলে তোমার একটুও পেট ভরবে না। তার চেয়ে বরং বিনিময়ে আমি তোমাকে অনেকগুলো গরু দিবো। তা দিয়ে এক মাস চলে যাবে তোমার।” বাঘ কথাটা শুনে ভেবে দেখল কথাটাতো মন্দ না। তাই সে হরিণটাকে ছেড়ে দিল। পরে হরিণ চলে গেল সেখান থেকে। আর বাঘ তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু চালাক হরিণকে আর পায় কে? হরিণতো তার উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জীবনে রক্ষা পেল। তাই গায়ের জোর না থাকলেও বুদ্ধির জোর সবচেয়ে দামি। এই গল্প থেকে আমরা অনেকগুলো শিক্ষা নিতে পারি: 1। কাউকে সহজেই বিশ্বাস করা ঠিক না। সহজেই বিশ্বাস করাটা বোকামি। 2। বিপদে পড়লে ভয় না পেয়ে বরং ভয়টাকে জয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 3। গায়ের শক্তি না থাকলেও বুদ্ধির জোর দিয়ে ...

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল)

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল) অক্টোবর 01, 2018 : বিভাগ- ভৌতিক / ভয়ংকর গল্প গল্প লিখেছেন :  সংগ্রহীত তখন আমি সিলেট বিভাগের জেলা ছাতকের খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকতা। আমাদের অফিসটা ছিল সুরমা নদী কোল ঘেষে। গাছগাছালী ঘেরা ছায়া মনোরম এক পরিবেশ । আমার অফিস থেকে একটু হেটে কিছুদুর গেলেই সুরমা নদীর পাড়ে ঘেষে একটা শশ্মান। ঐ শশ্মানে একটা মানুষ প্রমান কালীর মূর্তি ছিল । কালীর মূর্তিটার সারা শরীর ছিল কালো রংয়ের ছিল । পরনেও ছিল কালো রংয়ের একটা শাড়ি। পিছনে কালো এলোমেলো চুল গুলো নিতম্ব ছেড়ে নিচে নেমেছে। এক হাতে ত্রিশুল , আরেক হাতে একটা সাপ । মুখ থেকে অনেকটা বেরিয়ে থাকা লাল রংয়ের জিব্হাটা মুখ থেকে ভয়ংকর ভাবে বের হয়ে বুক ছুয়েছে। চোখ দুটি টকটকে লাল। ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে । হঠাৎ দেখলে চমকে উঠতে হয়। দিনের বেলা মুর্তিটাকে দেখলে তেমন একটা ভয় লাগত না , কিন্তু সন্ধ্যা বেলা পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দেখলে বুকের ভিতর অজানা এক ভয়ের শিহরন জাগত। তখন মনে হত ওটা মুর্তি নয়, সত্যি জীবন্ত ভয়ংকর এক মানবী । আমি শিহরীত হওয়ার জন্য প্রায় সন্ধ্যা বেলায় যেতাম। আমার এভাবে ওই সময় প্রায় যেতে দেখে অফিসের দাড়োয়ান একদিন ব...

ড্রাই আইস কী?

ড্রাই আইস আকর্ষ ণ  সৃষ্টির জন্যে বিভিন্ন সময় গানের স্টেজে অথবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় কুয়াশার মত ধোঁয়া দেখতে পাই আমরা। এটা আসলে ড্রাই আইস বা শুষ্ক বরফ নামেই পরিচিত। তার মানে কি এটা কঠিন পানি? কিন্তু পানি কঠিন হলে কি সেটা ধোঁয়ার মত উড়বে? ড্রাই আইস প্রথমে ড্রাই আইস কি সেটা বলি। সহজে বললে, শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কঠিন রূপকেই ড্রাই আইস বলে। অনেক কম তাপমাত্রায় এবং কম চাপে (−56.4 °C তাপমাত্রা এবং 5.13 atm চাপে) গ্যাসীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে রেখে দিলে সেটি তরলে রূপান্তরিত না হয়ে সরাসরি কঠিন পদার্থের আকার ধারণ করে। এই কঠিন পদার্থটিই আসলে ড্রাই আইস বলে আমরা জানি। তাহলে এই কঠিন পদার্থটি আবার ধোঁয়ার মতই উড়বে কিভাবে? আসলে ড্রাই আইসকে যখন উষ্ণ ও গরম পানির সংস্পর্শে আনা হয়, তখন মেঘের মত দেখতে শুভ্র ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই সাদা ধোঁয়াটি কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড নয়, অধিক ঘনমাত্রার পানির বাষ্পের সাথে মিশ্রিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড। ব্যাপার হচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ফলে গরম পানির বাষ্প ঘনীভূত হয়ে এমন আকার ধারণ করে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাহিত এই কুয়াশাটা অনেক ভারী হয়, তা...