Skip to main content

একটি দোকান ও তার সামনে কিছু মানুষ- গল্প

একটি দোকান ও তার সামনে কিছু মানুষ

নুসরাত নীলা
Nusrat Nilaঅবশেষে তাঁরা এখানে এসে পৌঁছাল! তাঁদের এই আগমনটা ছিল আকস্মিক! কোনো দৈব-দূর্বিপাক না ঘটলে লোকে এমন জায়গায় কখনোই আসতে চাইবে না! চারপাশটা ধোঁয়াচ্ছন্ন, কালো, গুমোট বাতাসে ভরা! দূরে দূরে ধূসর লতায়-পাতায় জড়ানো ছোট ছোট টং ঘর-দোকান। একদম পৃথিবীর চূড়া থেকে দেখলেও আপনি দেখতে পাবেন এমন ছোট ছোট দোকান যার আদি এবং অন্ত নেই! তবু লোকে চাইবে না এমন দোকানে একবেলার জন্যও যাত্রা বিরতি নিতে! একদম সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওরা পাঁচজন যাত্রা শুরু করেছিল, ওরা পৌঁছাতে চেয়েছিল একদম চূড়ায়; যেখানে মখমলের বিছানা পাতা; সবুজ কচি ঘাসগুলো যেখানে অবিরত রোদে ভাসে- কখনই তার রং হলদেটে নয়! তবু দেখ ভাগ্য, নিয়তি বলে যে শব্দ যা লোকে বিশ্বাস করে আবার করে না; যার পায়ে পায়ে পৃথিবীর মানুষগুলো আজও হেঁটে চলেছে; কারো বিশ্বাস-অবিশ্বাসে যার কিছুই যায় আসে না- সেই এক ভাগ্য, দৈবপাকে ওরা এখানে এসে পৌঁছাল!
সেদিন খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল, গলগল ক’রে আকাশ বেয়ে কাদা ঝরছিল। চারপাশে কাদায় জড়াজড়ি অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে পথ চলছিল এক যাত্রী। সে আসলে কোনো চূড়ায় পৌঁছাতে চায় নি-সে নিবিড়ভাবে চেয়েছিল মিশে যেতে, ভেসে যেতে বিশ্বাসে কিন্তু কাদামাখা শরীরে, জড়িয়ে আসা চোখে সে কিছুই দেখছিল না-একটা কোনো আশ্রয়ের জন্য সে ছুটছিল দিগ্বিদিক। ছুটতে গিয়েই সে ধাক্কা খেল অই পাঁচ যাত্রীর সঙ্গে যারা অইপাড় থেকে আসছিল-পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পথে কাদাবৃষ্টি না হ’লেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তারাও অনেকটা নাজেহাল হয়ে পড়েছিল। বিপর্যয় অনেক সময় অচেনা মানুষকেও এক করে, পরস্পরের কাছে আনে ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও। অই কাদামাখা শরীরের যাত্রী খুব সহজেই মিশে গেল আর পাঁচজনের সঙ্গে। সে পাঁচজনকে বোঝাল-প্রকৃতির বিরূপতা খুব বেশি সময়ের জন্য না; সে জানে, সে চেনে এই পথ-সামনেই চূড়া তার আগে একটা যাত্রা বিরতি নিতে হবে। সেই পাঁচজনের চারজন তার কথা বিশ্বাস করছিল না বা করলেও চুপ ক’রে ছিল। কথা বলছিল শুধু পাঁচজনের একজন। যে সত্যিকার অর্থেই বিপর্যয়ে ক্লান্ত ছিল বা আরো বেশি কিছু সে ভাবছিল! তার ভাবনা-চিন্তা খুব স্বচ্ছ নয় আর সবার কাছে। সে চূড়ার কথা ভাবছিল না। সে কেমন এক রহস্যে ঘেরা হাসি দিয়ে বলছিল,“সামনে কাছেই এক ছোট্ট আকাশ; চলো সবাই ঘুড়ি ওড়াই।” কে জানে এই যাত্রির ফেলে আসা কোনো জীবনের ঘুড়ি ওড়ানোর স্মৃতি ছিল কি না। তার চোখে চূড়া না, তার চোখে অন্য কিছু চকচক করছিল। হয়ত সে মিথ্যাই বলছিল। কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সবার পক্ষে নিজেকে সমস্ত পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। তখন মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। সমস্ত বোধ-বুদ্ধি একদম নিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। হয়ত বিপর্যয়ের সময় মানুষের আবেগ খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। তা নয়ত তারা পাঁচজন বেরিয়েছিল চূড়ায় পৌঁছাতে, হঠাৎ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তারা সবচেয়ে ভালো আশ্রয়ের সন্ধান করবে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে সেই যাত্রী কি না ঘুড়ি ওড়াতে চাইছে!
সেই চার যাত্রী দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর তাদের একজন ব’লে উঠল,‘আমরা এমন কোনো দোকানে যাত্রা বিরতি নিতে পারি না যেখানে বসার জায়গাটুকু নেই।’ কিন্তু তাঁর কথা তেমন আমলে নিল না ঘুড়ির স্বপ্ন চোখের যাত্রী। ততক্ষণে সে আর পাঁচ যাত্রীকে নিয়ে এক টং ঘরের দিকে চলেছে। ঠিক হয়েছে সেখানেই যাত্রা বিরতি করবে তারা। কাদা মাখা শরীরের যাত্রী তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই চিনত অই টং ঘরটা। তারা একটা নির্দিষ্ট টং ঘরে পৌঁছাল। চারপাশে আরো অনেক টং ঘর ছিল, তবু তারা অই টং ঘরটাতে গিয়ে থামল। একটা পাহাড়ের কিনারে ওটা কোনোমতে মাঁদারের গাছ আর সজনে গাছের ডালের খুঁটিতে দাঁড়িয়েছিল। খুঁটিগুলো এতই নড়বড়ে সামান্য বাতাসেই তা ভেঙে পড়তে পারে। আশপাশের আরো হাজার হাজার টং ঘর-সেগুলোর অবস্থাও খুব ভালো ছিল না। পাহাড়ের চূড়া থেকে বড় বড় পাথরের টুকরো গড়িয়ে এসে আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়ে ঘরগুলোকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।
তারা দোকানের সামনে পৌঁছালে পূর্বে দ্বিমত পোষণ করা যাত্রী বলল,‘আগেই বলেছিলাম বসার জায়গাটুকুও পাওয়া যাবে না, এখন কোথায় বসব?’ তিনি বিরক্ত হলেনÑদোকানঘরের পাশে অনেক ময়লা-আবর্জনা-সেগুলো যেন গায়ে না লাগে। সে যাত্রী প্রায় পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকল বসার মতো ক’রে! দোকানদার ছিলো মিশমিশে কালো রঙের। বেশ বয়স। পিঠটা তার যেন এই টং ঘর আর যা কিছুর দীনতায় খুব বেশি কুঁজো হয়ে গেছে-হাতের আঙ্গুলগুলো ছিল শক্ত আর ফোলা ফোলা। প্রথম যখন সে মুখ খুলল তার সমস্ত মুখ জুড়ে কেমন বিশ্রি কালো রং ছড়িয়ে পড়ল! এত সব বিসদৃশ বিষয় থাকার পরও দোকানদারকে সৎ আর বিনয়ি ব’লে মনে হচ্ছিল। যেন সে নুয়ে যাচ্ছিল আরো আরো বিনয়ে-যেহেতু এই সমস্ত মহান যাত্রী তারই দোকানে যাত্রা বিরতি নিয়েছে! দোকানদার কিছুই বিক্রি করছিল না। তার দোকানে দু’টো ঘুপচি মতো ছিল। যার একটাতে কিছু পড়ে ছিল, বাকিটা ছিল ফাঁকা। সামনে চকচকে একটা কেটলি থেকে গরম চায়ের ধোঁয়া উড়ছিল। দোকানদার সবাইকে বিনামূল্যে চা দিচ্ছিল। সে বলল, “আসলে সে কিছু বিক্রি করতে চায় না। সত্যি বলতে এরকম টংঘরের দোকানদার সে হতে চায় নি কোনোদিন। ভাগ্য তাকে এমন হাজারো টং ঘরের পাশে তাকে বসিয়ে দিয়েছে।” সে ঝিমাচ্ছিল। যখন এই যাত্রীরা এসে পৌঁছাল সে কিছুটা আশাবাদী হলো। যদিও সে জানত-তার টং ঘর এদের পছন্দ হবে না। ওরা সাময়িক যাত্রা বিরতি নিয়েছে। প্রকৃতি খানিক শান্ত হ’লেই ওরা চূড়ার দিকে যাত্রা করবে আবার।
এখানে পৌঁছে যেটা হলো-কাদামাখা শরীরের যাত্রী কেমন মিইয়ে গেল। সেই আর সবাইকে এখানে নিয়ে এসেছিল। মনে হলো-সমস্ত শক্তি দিয়ে তা অস্বীকার করতে চাইছে! বিব্রত ভাব নিয়ে সে দোকানের সামনের মাচার অনেক দূরে গিয়ে দাঁড়াল! বারবার সে সরে যাচ্ছিল আড়ালে বা প্রকাশে থাকা ভুলে যাচ্ছিল। যেন সে ছিল না এই পাঁচজনের সাথে। অথবা এই সামনের দোকানদারই মিথ্যা। দোকানদারের ছায়া তাকে গিলে খাচ্ছিল। যেহেতু সে নিজেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেও চূড়ায় পৌঁছাতে চায়। চূড়ায় পৌঁছানোর সুবিধা হলো আর কাদাবৃষ্টি তাকে মাখাতে পারবে না। কিংবা সে হয়ত ভেবেছিল, এই কাদাবৃষ্টি ধুতে হ’লে অই চূড়ায় পৌঁছান ছাড়া উপায় নেই-অই চূড়াতেই কেবল স্বচ্ছ জল মেলে যা দিয়ে কাদার শরীর অনায়াসে ধোয়া যায়। এই টং ঘর, এর দোকানদার তাকে আর পাঁচজন যাত্রীর পাশে; তার মনে হচ্ছিল-তাকে মুছে দিচ্ছে অই চূড়ার যাত্রায়। কিংবা এমনও হতে পারে, এই দোকানদারের জন্য তার অনেক মায়া কাজ করছিল। দোকানদার; যে আসলে কিছু বিক্রি করতে চায় না-খুব অসহায়, জীবনে সে এইরকম টংঘরের দোকানদার হতে চায় নি-এ সমস্ত কিছু অই পাঁচ যাত্রী একমাত্র তার কারণে জেনে গেল; যেহেতু সে আর কোথাও না তাদেরকে এখানেই যাত্রা বিরতি করিয়েছে। দোকানদারের এই আপাত লজ্জার জন্য সেই দায়ি; এই ভেবেই হয়ত সে আড়ালে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু যতই সরে যাচ্ছিল তার উপস্থিতি তত প্রকট আর করুণ হয়ে উঠছিল। সে মনে মনে কাঁদছিল। ভীষণ ক’রে চাইছিল এই টংঘরের সামনের কোনো অদৃশ্য বাতাসের দেয়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে। কিন্তু সেখানে কোনো অদৃশ্য বাতাস ছিল না। সবই খোলা আর করুণ প্রকাশিত! আরো চাইছিল, টং ঘরটার সামনে কাঁকর বিছানো রাস্তার নিচে শরীরটাকে শুইয়ে দিতে। কিন্তু সেটাও সম্ভব ছিলো না কারণ পথটা এতই ধূসর আর কাঁকরে ছাওয়া ছিলো যে শরীরটা এতে শোয়াতে গেলে কাঁকরগুলো ছড়িয়ে পড়ে বীভৎস শব্দের সৃষ্টি হতো-যাতে নিজের রূপ আরো বেশি ক’রে খুলে যেত। তাই সে মনভোলান অই পথই ধরল; আর পাঁচ যাত্রীর সঙ্গে থেকেও মনে করল সে নেই কিংবা অস্তিত্বহীন এই টং ঘর-জীবনে এমন কিছুর সামনে সে কোনোদিন দাঁড়ায় নি। কিন্তু সত্যি বলতে তার খুব মায়া করছিল অই দোকানদারটার জন্য। এ এমন এক মায়া যার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না তার কাছে। মনে হচ্ছিল-সে অনেকদিন এইরকম কোনো টংঘরের দোকানদারের শিয়রে ব’সে ফিসফিস ক’রে কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু কী যে বলতে চাইছিল বা এখনো চায়-তা স্পষ্ট না তার কাছে!
অন্য পাঁচ যাত্রীর ব্যাগে বেশ কিছু জমানো খাবার ছিল; ওরা চূড়ার যাত্রায় সঙ্গে সেগুলো বেঁধে নিয়েছিল। সেগুলো থেকে একটা খুবই দামি বিস্কুটের প্যাকেট ঘুড়ির স্বপ্ন চোখের যাত্রী দোকানদারকে দিল। তারা সবাই মিলে তখন বিস্কুট খাচ্ছিল। কাদামাখা শরীরের যাত্রী সর্বময় প্রার্থনায় চাইছিল দোকানদার অই বিস্কুট না নিক, না খাক। হলো সে দোকানদার তবু ওদের অই বিস্কুট নিলে সে আরো শরমে ম’রে যাবে-প্রকাশিত হয়ে পড়বে দোকানদারের আরো করুণ রূপ। এ কি দয়া নয়? দোকানদার কেন তা নিতে চায়? দোকানদার কী, দোকানদার কে, সে কী পাবে জীবনে বা তার কী পাওয়া উচিত-সেসব কিছুর ভাবনা তার নিজের হ’লেও কাদার শরীর বারবার কেমন দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিল। সে চূড়ার দিকে যেতে চাইছিল। আবার কী এক অজানা মায়ায় এই টংঘরের দোকানদার তাকে টানছিল! তার শরীর ধোয়ার পানি অই চূড়ায় মিলতে পারে আবার নাও মিলতে পারে। তার মনে হচ্ছিল, এই টংঘরেই তাকে মানিয়ে যায়; কাদার শরীর না ধুলেও চলে। এই সামান্য টংঘরের দোকানদার তাকে কাদার শরীরেই ভালোবাসবে। এমন সাধারণ দোকানদার, এমন করুণ চোখ-দয়ায় আদ্র।
সে লুকিয়ে যাচ্ছিল আবার নিজেকে মেলে ধরছিল প্রাণপণে যেন দোকানদার তাকে দেখতে পায়, ভরসা পায়-সে আছে তার সাথে। ঘুড়ির স্বপ্ন চোখের যাত্রী তখন চুপ। সে আর কিছু বলছিল না। মনে হলো তার দৃষ্টি কেমন ঘুরে গেল! সে কি ঘুড়ি ওড়াতে চাইছিল না আর? যে যাত্রী সবচেয়ে বিরক্ত ছিল সে বারবার আড়চোখে দেখছিল অই টংঘরের দোকানদার সব বিস্কুট খেয়ে ফেলল কি না। সে যারপরনাই বিরক্ত হয়ে মনে মনে ছুটছিল, বলছিল, সেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে এই এতদূর আসতে। তাই তার অধিকার অই বিস্কুটে সবচেয়ে বেশি। সে কেড়ে নিল বিস্কুটের প্যাকেট আর বলল, অন্যের হক নষ্ট করতে নেই। এই যাত্রীর সঙ্গে লেপটে ছিল যে সবচেয়ে বেশি সেই যাত্রী নিজের মত কিছুই বলছিল না। মনে হচ্ছিল, তার সঙ্গের একদম লেপটে থাকা যাত্রীর কথারই অনুরনণ তুলে যাচ্ছে সে-আর কিছু না। একদম মেরুদণ্ডহীন যাত্রী।
সে দোকানদারের কাছে চা চাইল। বলল, অই ধোঁয়া ওঠা চা তার প্রাপ্য। বিকেল হয়ে আসছিল তখন। বিকেলের নাশতা হিসেবে টংঘরের অই করুণ দোকানদার তাকে এককাপ ধোঁয়া ওঠা চা বিনামূল্যে দিয়ে দিল। সে একটু দূরে সরে গিয়ে ব’সে সেই চা পান করতে লাগল। তার সঙ্গের যাত্রী আরো বিরক্ত হলো। দেখছিল তার মেরুদণ্ডহীন সঙ্গীর চা পানের দৃশ্য। মন বলছিল, অই কাপে নোংরা লেগে আছে। মনে পড়ল-দামি ব্র্যাণ্ডের কাপ ছাড়া কোনো কিছুতে তারা কখনো চা পান করে নি। এই জ্বালাময়ী টংঘর তার অন্তর-বাহির পোড়াচ্ছিল-পুড়ছিল সে। আর বাকি দুই যাত্রী তখন চুপচাপ বসে ছিল। ভাবছিল তারা, কখন প্রকৃতি ঠাণ্ডা হবে। তাদের লক্ষ্য অই চূড়া, আর কিছু না। যদিও ওরাও নড়ছিল। বিরক্ত হচ্ছিল। তবে কমই, সামান্য। বিচ্ছিন্ন প্রজাতির মতো তারা এই দলের সাথে ঐক্য রেখে চলছিল। এ বেশ দ্বিধা আর দ্বন্দের। এরপর এই সবকিছু শেষ হলো। কে খেলো, কে খেলো না, কে পেল, কে পেল না বা কতটুকু পেল-তার হিসাব অন্যদিন দেখে নেয়া যাবে। এখন যখন প্রকৃতি শান্ত আর চূড়া ছাড়া তাদের আর কোনো নিয়তি নেই, থাকলেও তারা মানে না; কখনো কখনো তারা নিজেরাই নিয়তির স্রষ্টা-তারা যাত্রার জন্য আবার প্রস্তুত হলো।
এই পাঁচ যাত্রীর টংঘরে যাত্রা বিরতি করানো যাত্রী আর পাঁচ যাত্রীর পেছনে চলতে শুরু করল। সে আর পথ দেখাচ্ছিল না। বিরক্ত হওয়া যাত্রী বলল, সে শুধু এইরকম টং ঘরই দেখাতে পারে আর কিছু না। ঘুড়ির স্বপ্ন চোখের যাত্রী মনে হচ্ছিল তখন ঘুমাচ্ছে, ঘুমাতে ঘুমাতে পথ চলছে; মায়ের বুকে লেপটে থাকা শিশুর মতো যেন সে! পেছনে চলতে চলতে টংঘরের পথ দেখান যাত্রী বারবার টংঘরটার দিকে তাকাচ্ছিল। সে কি কিছু ফেলে যাচ্ছিল? কী, অই টংঘর? দোকানদার? তার খালি বাক্স? দোকানটার সামনের বাঁশের মাচান? এই লতা, এই পাতা? এই প্রাচীন পথ-তার শাখা-প্রশাখা? কী, কোন্টা? কোন্ কিছু? চলে গেল যাত্রীরা।
অবসন্ন দেহ নিয়ে বিষন্ন চোখে দোকানদার তাদের যাবার পথে তাকিয়ে থাকল। সূর্য তার ঘোমটা টেনে দিলে দোকানদার তার দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিল। তারপর একটা অল্প আলোর কূপি বাতির সলতে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া ক’রে কিছুটা আলো বাড়িয়ে নিয়ে দোকানদার তার দোকানের একটু পেছনেই আড়ালে থাকা বাড়ির দিকে পা বাড়াল। রাত তখন চড়ছে। গভীরতার দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ ভেতর থেকে ছুটে এল দীর্ঘ কান্নার শব্দ। ছোট্ট ছোট্ট দুইটা বেণী মাথার দুইপাশে ঝুলিয়ে দৌড়ে তার বুকে এসে পড়ল মেয়েটা, দোকানদারের ছোট মেয়েটা। ভেতর থেকে কেউ জোরে চিৎকার দিয়ে বলছিল,“ও দোকানদার, ও টংঘরের দোকানদার সর্বনাশ হয়ে গেল তোমার!” ‘কী সর্বনাশ?’ দোকানদার আর্তনাদ ক’রে উঠল। কেউ বলল, তোমার বড় মেয়েটাকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে! তোমার আলাভোলা মেয়েটাকে ছেলেধরা চুরি ক’রে নিয়ে গেছে। হায় হায় ক’রে উঠল দোকানদার। ‘কেউ দেখে নি? কেউ ছিল না ওকে দেখার?’ না। উত্তর এলো, না। সবাই কাজে ব্যাস্ত ছিলো। আলাভোলা মেয়েটা এই ফাঁকে একটা বোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে ছুটছিল। আলাভোলা মেয়েটাকে এরপর ছেলেধরা ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে ঘুড়ি ওড়ানোর কথা ব’লে! ‘এইবার মেয়েটাকে কোথায় খুঁজবে?’ কোথায় খুঁজবে দোকানদার-এইরকম টংঘরের দোকানদার, অই চূড়ায়?

সংগৃহীত।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্

বাঘ ও হরিণ: শিক্ষামূলক গল্প - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - এক বনে ছিল এক হিংস্র বাঘ। সে যেকোনো প্রাণীকে দেখলেই ঝাপিয়ে পড়তো। কাউকে সে মানতো না। একদিন এক নিরীহ হরিণ সেই বাঘের কবলে পড়লো। হরিণটা অনেক যুদ্ধ করেও পালাতে পারলো না। বাঘ মাত্র ওকে সুবিধামতো কামড় বসাবে। এমন সময় হরিণের মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। হরিণ বলল, “ওহে বাঘ। তুমিতো সবাইকেই খাও। আমায় না হয় ছেড়ে দাও। আমার মাংস খেলে তোমার একটুও পেট ভরবে না। তার চেয়ে বরং বিনিময়ে আমি তোমাকে অনেকগুলো গরু দিবো। তা দিয়ে এক মাস চলে যাবে তোমার।” বাঘ কথাটা শুনে ভেবে দেখল কথাটাতো মন্দ না। তাই সে হরিণটাকে ছেড়ে দিল। পরে হরিণ চলে গেল সেখান থেকে। আর বাঘ তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু চালাক হরিণকে আর পায় কে? হরিণতো তার উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জীবনে রক্ষা পেল। তাই গায়ের জোর না থাকলেও বুদ্ধির জোর সবচেয়ে দামি। এই গল্প থেকে আমরা অনেকগুলো শিক্ষা নিতে পারি: 1। কাউকে সহজেই বিশ্বাস করা ঠিক না। সহজেই বিশ্বাস করাটা বোকামি। 2। বিপদে পড়লে ভয় না পেয়ে বরং ভয়টাকে জয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 3। গায়ের শক্তি না থাকলেও বুদ্ধির জোর দিয়ে ...

ড্রাই আইস কী?

ড্রাই আইস আকর্ষ ণ  সৃষ্টির জন্যে বিভিন্ন সময় গানের স্টেজে অথবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় কুয়াশার মত ধোঁয়া দেখতে পাই আমরা। এটা আসলে ড্রাই আইস বা শুষ্ক বরফ নামেই পরিচিত। তার মানে কি এটা কঠিন পানি? কিন্তু পানি কঠিন হলে কি সেটা ধোঁয়ার মত উড়বে? ড্রাই আইস প্রথমে ড্রাই আইস কি সেটা বলি। সহজে বললে, শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কঠিন রূপকেই ড্রাই আইস বলে। অনেক কম তাপমাত্রায় এবং কম চাপে (−56.4 °C তাপমাত্রা এবং 5.13 atm চাপে) গ্যাসীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে রেখে দিলে সেটি তরলে রূপান্তরিত না হয়ে সরাসরি কঠিন পদার্থের আকার ধারণ করে। এই কঠিন পদার্থটিই আসলে ড্রাই আইস বলে আমরা জানি। তাহলে এই কঠিন পদার্থটি আবার ধোঁয়ার মতই উড়বে কিভাবে? আসলে ড্রাই আইসকে যখন উষ্ণ ও গরম পানির সংস্পর্শে আনা হয়, তখন মেঘের মত দেখতে শুভ্র ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই সাদা ধোঁয়াটি কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইড নয়, অধিক ঘনমাত্রার পানির বাষ্পের সাথে মিশ্রিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড। ব্যাপার হচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ফলে গরম পানির বাষ্প ঘনীভূত হয়ে এমন আকার ধারণ করে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাহিত এই কুয়াশাটা অনেক ভারী হয়, তা...

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল)

ভয়ংকর ভূতের গল্প (চুড়েল) অক্টোবর 01, 2018 : বিভাগ- ভৌতিক / ভয়ংকর গল্প গল্প লিখেছেন :  সংগ্রহীত তখন আমি সিলেট বিভাগের জেলা ছাতকের খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকতা। আমাদের অফিসটা ছিল সুরমা নদী কোল ঘেষে। গাছগাছালী ঘেরা ছায়া মনোরম এক পরিবেশ । আমার অফিস থেকে একটু হেটে কিছুদুর গেলেই সুরমা নদীর পাড়ে ঘেষে একটা শশ্মান। ঐ শশ্মানে একটা মানুষ প্রমান কালীর মূর্তি ছিল । কালীর মূর্তিটার সারা শরীর ছিল কালো রংয়ের ছিল । পরনেও ছিল কালো রংয়ের একটা শাড়ি। পিছনে কালো এলোমেলো চুল গুলো নিতম্ব ছেড়ে নিচে নেমেছে। এক হাতে ত্রিশুল , আরেক হাতে একটা সাপ । মুখ থেকে অনেকটা বেরিয়ে থাকা লাল রংয়ের জিব্হাটা মুখ থেকে ভয়ংকর ভাবে বের হয়ে বুক ছুয়েছে। চোখ দুটি টকটকে লাল। ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে । হঠাৎ দেখলে চমকে উঠতে হয়। দিনের বেলা মুর্তিটাকে দেখলে তেমন একটা ভয় লাগত না , কিন্তু সন্ধ্যা বেলা পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দেখলে বুকের ভিতর অজানা এক ভয়ের শিহরন জাগত। তখন মনে হত ওটা মুর্তি নয়, সত্যি জীবন্ত ভয়ংকর এক মানবী । আমি শিহরীত হওয়ার জন্য প্রায় সন্ধ্যা বেলায় যেতাম। আমার এভাবে ওই সময় প্রায় যেতে দেখে অফিসের দাড়োয়ান একদিন ব...